০৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ১০:২৫ পিএম
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক নিয়োগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত

একই জায়গায় দুই চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবেন 

একই জায়গায় দুই চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবেন 
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হোমিও চিকিৎসায় আরো গবেষণা বাড়াতে হবে।

আসাদুল ইসলাম দুলাল: অতটা বিজ্ঞান নির্ভর না হলেও বেশ আগে থেকে প্রচলিত আছে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি। উৎপত্তিস্থল জার্মানিতে এ পদ্ধতি অনেকটা নির্বাসিত হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি দেশেও সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে এ চিকিৎসা পদ্ধতি। বর্তমান সরকার এই পদ্ধতির উপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে পরিষ্কার।

ঢাকায় একটি সেমিনারে তিনি জানান, দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে ক্রমান্বয়ে হোমিও চিকিৎসক নিয়োগ করা হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, হোমিও চিকিৎসায় কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। বিশ্বব্যাপী হোমিও চিকিৎসার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার পাশাপাশি দেশে হোমিও চিকিৎসা আরো বিকাশ ঘটানো হচ্ছে। অল্টারনেটিভ (ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথি) চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও প্রসার লাভ করুক, যা আমরা কাজের মাধ্যমে এটা প্রমাণ করেছি।

মন্ত্রী আরও বলেন, আমর সবাই জানি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা অনেক পুরনো পদ্ধতি এবং এটা স্বীকৃত পদ্ধতি। অনেকে এই চিকিৎসা গ্রহণ করেন। প্রত্যেকটি ইউনিয়নে এই চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এই হোমিও চিকিৎসায় আরো গবেষণা বাড়াতে হবে এবং এই খাতে বাজেট বৃদ্ধি করা হবে।

এ নিয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক, পেশাজীবী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞ মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকে এই চিকিৎসা পদ্ধতি সমর্থন করছেন না। আবার অনেকে সমর্থন করলেও তারা ভিন্ন ভিন্ন পরামর্শও দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মোকতেল হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, এই মুহূর্তে সকল সরকারি হাসপাতালে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা যৌক্তিক নয়। শুধু উপজেলা পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান মেডিভয়েসকে বলেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা যেহেতু কিছুটা বিজ্ঞানভিত্তিক হচ্ছে। সে কারণে তাদের চিকিৎসার পৃষ্ঠপোষকতা সরকার করতে পারে। এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু তাদের জন্য আলাদা চিকিৎসা কেন্দ্র করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, একই জায়গায় দুটি চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করলে, রোগীরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবেন। যেহেতু এই বিকল্প চিকিৎসার জন্য শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে তারা লেখাপড়া করছেন। সেই মোতাবেক অ্যালোপ্যাথিক ও বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি একসঙ্গে করলে যৌক্তিক হবে না। রোগীদের জন্য সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা থাকতে হবে। এ বিষয়ে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ থাকবে। এখন প্রতিটা হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা (অ্যালোপ্যাথিক) ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের যদি নতুন করে নিয়োগ বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তাদের জন্য আলাদা করে হোমিওপ্যাথি হাসপাতালের ব্যবস্থা করা উচিত। যেখানে আলাদা ব্যবস্থাপনা পত্র, ব্যবস্থাপনা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকবে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নতুন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. জামাল উদ্দীন চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, আগে থেকেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে নিয়োজিত আছে। এটা নতুন কিছু নয়, কারণ আগেও ১৫৩ জন চিকিৎসক ও পরে ১৫৩ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিকল্প (ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথি) এই ৩টি চিকিৎসা পদ্ধতিতে ১০০ করে চিকিৎসক আগেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা সরকারি পলিসিতে আগে থেকেই আছে।

চিকিৎসকদের মধ্যে অনেকে এ বিষয়টাকে যৌক্তিক মনে করছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর সরকারের পলিসি আছে এবং এটা গ্রহণযোগ্য পলিসি। অবশ্যই স্বাচিপ এই পলিসিকে সমর্থন করে। যারা এ বিষয়টা যৌক্তিক বলে মনে করছেন না, তারা আসলে বিষয়টা জানেন না।

বিষয়টি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ মেডিভয়েসকে বলেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের দুর্বলতা আছে। সরকার যদি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা করে, সেক্ষেত্রে শুধু তাদের ওষুধ লিখতে পারবেন, অন্য কোনো ওষুধ লিখতে পারবেন না।

এই নিয়োগের ধরন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, সকল সরকারি মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা কীভাবে সম্ভব? হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়টা সমর্থন করতে পারছি না। যদিও নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে তাদের জন্য স্পষ্টভাবে আলাদা গাইডলাইন করা উচিত।

চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিজের (এফডিএসআর) দপ্তর সম্পাদক ডা. রশিদুল হক রানা মেডিভয়েসকে বলেন, দেশে হোমিওপ্যাথি, ইউনানি এবং আয়ুর্বেদিকসহ বিকল্প অনেক চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে এসব চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আলাদা করা হয়েছে এবং বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়ও গঠন করা হয়েছে। এখন আমাদের মেডিকেল বা আধুনিক বিজ্ঞানের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। এই চিকিৎসা বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া হয়, যাতে রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে এই চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ জীবন-যাপন করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের অনেক ভরসা রয়েছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। বিশেষ করে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত না। একজন রোগীকে কোন ওষুধ দেওয়া হলে, তার কোনো উপকার হবে, সেটা বিজ্ঞান গবেষণা করে প্রমাণ করবে। যেমন- করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা হয়েছে। এই ভ্যাকসিনের পেছনে অনেক গবেষণা ও ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে, সেজন্য অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এরপর যখন প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ভ্যাকসিন নিরাপদ, তখন সাধারণ মানুষের দেহে প্রদান করা হয়েছে। ঠিক একইভাবে একটি ওষুধ যখন কাউকে দেওয়া হবে, তখন মনে রাখতে হবে যে, এটি গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত কিনা।

ডা. রশিদুল হক রানা বলেন, আমাদের দেশে এই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বৈজ্ঞানিকভাবে কতটুকু প্রমাণিত? একটি ক্যান্সার রোগীকে হোমিওপ্যাথি ডোজ খাওয়ানো হলে, রোগী যদি ভালো না হয়ে মারা যান, তাহলে এর দায়িত্ব কে নিবেন? সুতরাং যে চিকিৎসা ব্যবস্থা মানুষের জন্য বৈজ্ঞানিভাবে প্রমাণিত হয়েছে, শুধু সেটিকে অনুমোদন দেওয়া উচিত, অন্যটিকে নয়।

তিনি বলেন, হাসপাতালে কোনো রোগী গোঁজামিলের চিকিৎসা গ্রহণ করুক, আমরা তা সমর্থন করি না। সাধারণ মানুষকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণযোগ্য চিকিৎসা দিতে হবে। সুতরাং যা মানুষের জন্য ভালো চিকিৎসা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

এফডিএসআরের দপ্তর সম্পাদক বলেন, হাসপাতালে রোগীরা সবসময় নিরাপদ চিকিৎসা নিবেন। যদি দেশের সাধারণ মানুষকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। সে লক্ষ্যে আলাদা মন্ত্রণালয় করার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক নেতা।

জানা গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ২৫০ জনের মতো বিকল্প মেডিসিনের চিকিৎসক নিয়োগ পেয়েছেন৷ আরো ২৫০ জনের মতো চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন আছে৷ প্রতিটি জেলা হাসপতালে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে৷ উপজেলা হাসপাতালেও এই ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হচ্ছে৷ সারা দেশে এর গ্র্যাজেুয়েট রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দেড় হাজারেও বেশি৷ সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অল্টারনেটিভ মেডিসিনের একটি সেল করেছে৷ তার অধীনে একজন পরিচালক এই বিকল্প মেডিসিনের বিষয়গুলো দেখেন৷

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক